মানুষের জীবনে প্রেম আসে নানা রঙে নানা আঙ্গিকে। যে কোনো বয়স বা পরিস্থিতিতেই এর আগমন ঘটতে পারে। সালাম এবং শাহিদার জীবনেও প্রেম আসে। ওদের সংসার আছে, আছে সমাজ। দাম্পত্য জীবনের নানামুখি টানাপোড়েনও আছে। এরই মাঝে বঙ্কিম রেখায় এগিয়ে চলে প্রেম। গৃহবধূ শাহিদা সংসারের সব চাহিদা স্বাভাবিক রেখেও সালামের সাথে সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। চৌর্য বৃত্তিরত সালামের স্ত্রী আম্বিয়া তাকে একান্ত করেই পেতে চায়। নিরন্তর চেষ্টাও থাকে তার। সালাম স্ত্রীর কাছেই ফিরে আসতে চায়। কিন্তু নেশার ঘোরের মতো ছুটে যায় শাহিদার কাছে। সালাম চৌর্যবৃত্তির দায়ে একসময় ধরা পড়ে। শাহিদার ঘরে চুরি করতে গিয়ে মনস্তাত্তি¡ক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। স্ত্রী মনে করে সে চুরি করতেই গেছে; শাহিদার কাছে তো যায়নি। শাহিদা মনে করে সে কেনো চুরি করতে এলো? তার কাছে একান্তেই আসতে পারতো। সালাম চুরির দায়ে শাস্তি পায়। আত্মতৃপ্ত স্ত্রীর একান্তই ধারণা ‘স্বামী তারই আছে’ শাহিদার আকর্ষণ হয়তো তার মাঝে নেই। শাহিদার মনে সালামের প্রতি ঘৃণা জন্মে। সে কেনইবা চুরি করতে এলো তার ঘরে? প্রেমিকা এবং স্ত্রীর মধ্যে যে মনস্তাত্বিক দ্বন্দ্ব, তা এই নাটকের মূল বিষয়। তবে কি সালাম সত্যই চুরি করতে গেছে, নাকি শাহিদার আকর্ষণে ছুটে গেছে? এই দ্বন্দ্ব পাঠক-দর্শককে ভাবাবে।

চরিত্রলিপি

০১. কাশেম        : সত্তর বছর
০২. জয়নাল        : আট বছর
০৩. শাহিদা        : আটাশ বছর
০৪. ভগার দাদা        : পঁচাত্তর বছর
০৫. আশরাফ মাস্টার    : ত্রিশ বছর
০৬. মতি            : পঁয়ত্রিশ বছর
০৭. শাহাবুদ্দিন মাস্টার    : ত্রিশ বছর
০৮. ছেলের দল        : সাত থেকে বারো বছর
০৯. আজাহার        : পঁচাত্তর বছর
১০. সালাম        : পঁয়ত্রিশ বছর
১১. জমিন            : পনের বছর
১২. সলেমান        : চল্লিশ বছর
১৩. গ্রামপ্রধান        : পঁঞ্চাশ বছর
১৪. আম্বিয়া        : ত্রিশ বছর
১৫. শরপেশ        : বাইশ বছর
১৬. নতুন বউ        : আঠারো বছর
১৭. শাশুড়ি        : পঁঞ্চাশ বছর
১৮. শ^শুর            : পঞ্চান্ন বছর
১৯. জাহাঙ্গীর        : বাইশ বছর
২০. রহিম            : ত্রিশ বছর
২১. গ্রামবাসী        : বিভিন্ন বয়সী


দৃশ্য এক:

(নদী থেকে ঢালু রাস্তা উপরের দিকে চলে গেছে। কাঁচা মাটির সড়ক। এক পাশে একটা বিরাট জাম গাছ। জামগাছের নিচে টুল পেতে বসে আছেন একজন বৃদ্ধ। নাম কাশেম সরদার। বয়স পঁচাত্তরের কাছাকাছি। তার হাতে হাতপাখা। পাশে আট-নয় বছরের একটি ছোটো ছেলে হাঁটুমুড়ে বসে আছে। ছেলেটির পিঠে একটি মন্ত্রপূত কাঁসার থালা বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। ছেলেটির ভয় দূর করার মন্ত্রপূত লোকচিকিৎসা চলছে।)

কাশেম    :    কীরে ভয় পাইছু? মাছটা কত বড়ো আছিলো?
জয়নাল    :    এত্ত বড়ো। (দুই হাত প্রসারিত করে দেখায়)
কাশেম    :    মাছটা একটা ঘাঁই মারলো আর তুই হুড়মুড় করে জালশুদ্ধ পইরা গেলি?
জয়নাল    :    হ।
কাশেম    :  তোর বাপ কী করিচ্ছিলো তখন?
জয়নাল    :    বাপ বাদামের দড়ি এক হাতে, আর বইঠ্যা এক হাতে ধইরে আছিলো। বাপ বিড়ি ধরার যোগার করইতে গিয়াই একটো ঝাঁকি খাই। তাতেই আমি উল্টে যাই।
কাশেম    :    হু।
জয়নাল    :    আর কতুক্ষুণ দাদা। পিঠখান ঘাইমা একেবারে চুপচুপা হয়্যা গেল। চুলকাছে যে।
কাশেম    :    অ্যাই ছ্যামড়া। একদম চুলকাবি না। নড়লেই থালা পইড়ে যাবে। তখুন ভয় কিন্তু দূর হবিনানে।
জয়নাল    :    থালা পড়ি গেলেই তো বাঁচি।
কাশেম    :    কতা কম ক ছ্যামড়া। ভয় সম্পূর্ণ দূর না হইলে থালা পইড়ে গেলে তো কাজ হবি নানে। ই মুন্তুর অনেক পাকা ওস্তাদের বুঝলি? যখুন তোর সব ভয় চলি যাবি, তখন থালা আপনা-আপনিই খসি যাবি বুঝলি?
জয়নাল    :    ও দাদা। তুমি কী সত্যি সত্যি কামাক্ষায় গেছিলা? খুব সুন্দর পাহাড়ী দ্যাশ না?
কাশেম    :    হ খুব সুন্দর। সবুজ সবুজ খাড়া খাড়া পাহাড়।
জয়নাল    :    কী খাইছিলা ওই দ্যাশে যাইয়া।
কাশেম    :    বাঁশকোড়ল, চোয়ানি আরো কত কী?
জয়নাল    :    দাদা আর কতক্ষুণ?
কাশেম    :    চুপ কর ছ্যামড়া। লড়িস না। আর একটু ভয় আছে। ভয়টুকু গেলেই থালা পড়ে যাবিনি।

(সংসারের কাজে অসাধারণ পটু শাহিদা। মেয়েলি গীতের গলা অত্যন্ত মিষ্টি। অতিথিপরায়ণ আর পরোপকারীও। শাহিদা গরুকে বিচালি খেতে দেয়। খৈল, লবণ আর ধানের কুড়া পানিতে মেশায় আর বিড়বিড় করে কিছু একটা বলতে থাকে।)

কাশেম    :  বউমা, তোমার ব্যাটার তো ভয় দূর হইছে আমি আখুন তাইলি আসি।
শাহিদা     :    হ কাকা। তাইলে আমার ব্যাটার গাই বিয়াইলে আইসেন কিন্তু। দুধ দিয়া ভাত খায়া যাইয়েন।


দৃশ্য দুই:

(একটি টিনের ছাপড়া ঘর। বাঁশের মাচার উপর শুয়ে আছেন জবুথবু বৃদ্ধ ভগার দাদা। চোখে দেখে না, কানে শোনেন না। মুখে একটাই বোল ‘একটো বিড়ি দে’। অভ্যাসের বশে বিলাপের সুরেই সে উচ্চরণ করে একটো বিড়ি দে। নদী পার হয়ে ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাওয়ার পথে ভগার দাদার ছাপড়া বারান্দার পাশে জটলা করে দাঁড়ায়।)
ভগার দাদা    :    একটো বেড়ি দে। একটো বেড়ি দে। … বিড়বিড় করে বলতে থাকে।
জয়নাল    :    ও ভগার দাদা বেড়ি ল্যাও।
ভগার দাদা    :    (হাত বাড়িয়ে বিড়ি নেন) ঝাপসা চোখে, অভ্যস্ত ভঙ্গিমায় শুয়ে শুয়ে বিড়ি টানে।
আশরাফ মাস্টার    :    কীরে জয়নাল? তুই এইখানে? স্কুলে যাসনি?
জয়নাল    : জে না স্যার।
আশরাফ মাস্টার    :    বিড়ি কোথায় পাইলি? কান ধর। কান ধর। বদমাশ কোথাকার।
জয়নাল    :    (জয়নাল কান ধরে কাঁদতে থাকে) স্যার, কিনছি।
আশরাফ মাস্টার    :    টাকা কে দিয়েছে?
জয়নাল    :    স্যার, চাইল বেইচে কিনছি।
আশরাফ মাস্টার    :    চাইল কোথায় পাইছিস।
জয়নাল    :    আব্বা কাম করছিলো। হাসেন চিয়ারম্যানের বাড়িত কাম কইরে ট্যাকা পাইছিলো।
আশরাফ মাস্টার    :    চাল চুরি করে বিক্রি করেছিস?
জয়নাল    :    হ
আশরাফ মাস্টার    :    চাল বেচে বিড়ি কিনেছিস? শয়তান কোথাকার। (কয়েকটা থাপ্পর বসিয়ে দেয়)
(জয়নাল কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি চলে গেল)।

(জয়নালের বাবা মতি রাগে গজরাতে গজরাতে স্কুলে এসে হাজির। আশরাফ মাস্টারের উপর খুব খ্যাপা সে।)
মতি    : কোথায়? কোথায় আশরাফ মাস্টার? আমার জয়নালের গায়ে হাত তোলে কোন সাহসে?
শাহাবুদ্দিন মাস্টার    :    কী হয়েছে, মতি মিয়া? কী হয়েছে?
মতি    :    আমার জয়নালের গায়ে হাত তুলেছে তোমার ঐ আশরাফ মাস্টার। তার চেহারাটুকুন একবার দেখবার আইছি।
শাহাবুদ্দিন মাস্টার    :  শান্ত হও মতি।
মতি    : আরে রাখো তোমার। আমার মাথাত আগুন ধইরে গেছে।
শাহাবুদ্দিন মাস্টার    :    থামো মতি। থামো বলছি। কী হয়েছে আগে শুনি।
মতি    ;    ঐ সব কথাবার্তা বাদ দেন। আগে কন মাস্টার কোথায়?
শাহাবুদ্দিন মাস্টার:        এত চেচাচ্ছো কেন? এলোমেলো কথা বাদ দাও। আগে কথা শুনি, তারপর যা হয় করা যাবে।
মতি    :    রাখো তোমার শোনাশুনি। কত ইন্টার-মেট্টিক মাস্টার দেখলাম। আর তোমার ঐ বিকম পাস মাস্টার তার কথা কি শুনবো? সে তো বেশি পড়েই নাই। কম পইড়ে আবার আমার জয়নালের গায়ে হাত তোলে।
(স্কুলের সামনে একটি হট্টগোল তৈরি হয়ে যায়। অনেক লোকজনের জটলা, শোরগোল দেখে আশরাফ মাস্টার এসে হাজির।)
মতি    :    ও। তুমি আমার ছাতার মাস্টাররে। আমার ছেলেকে ধরে মারো।
আশরাফ মাস্টার    :    মতি, মাথা ঠান্ডা করো।
মতি    :    মাথা ঠান্ডা করবো তোমার ভয়ে? আমি কি তোমার ধার ধারি নাকি?
আশরাফ মাস্টার    :    মতি। আমার কথা শোনো। (সকলে সমস্বরে বলে মাস্টারের কথা শোনো।)
মতি    :    বলো মাস্টার।
আশরাফ মাস্টার    :  তোমার ছেলে ভগার দাদার সাথে বিড়ি খেয়েছে। চাল বিক্রি করে বিড়ি কিনে খেয়েছে।
মতি    :    ভালো-মন্দ কিছু খাওয়াতেই পারিনা। বেড়ির ছাতাডা খাইছে তাতেই তোমার মারা লাগবে? ছেলে আমি জন্মাইছি না তুমি?

(আবোল তাবোল বকতে থাকে সবাই মিলে মতিকে ধরে স্কুল সীমানার বাইরে নিয়ে যায়। শাহাবুদ্দিন মাস্টারের কথায় মতি শান্ত হয়। নিজের ভুল বুঝতে পারে।)


দৃশ্য তিন:

(বৃদ্ধ আজাহার একা একা কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকে গাছের তলে। লোমশ, ঘন দাড়ি আর শক্ত শরীরের লম্বা মানুষ। দীঘল চেহারায় কাঠিন্য প্রতিভাত হয়। জমিতে ফসল হয় না বলে নিত্য অভাবের সাথে যুঝতে যুঝতে ভিটেটুকুও হাতছাড়া। এখন তার মাথায় বিকার দেখা দিয়েছে। গ্রামের ছেলেরা তাকে নানাভাবে উক্ত্যক্ত করে।)
ছেলের দল    :    ও আজাহার ডাম্ফু। আজাহার ডাম্ফু?
আজাহার    :    (ভীষণ ক্ষেপে ওঠে, মা, বাবা তুলে গালিগালাজ করে) পেন্দির বাচ্চা! তোর মায়ের …।
ছেলের দল    :    আজাহার ডাম্ফু? ডাম্ফু?
আজাহার    :    তবে রে। হারামজাদার দল। (ওঠার ভান করে। উঠতে পারে না। ছেলেরা ভয়ে পালিয়ে যায়। ভবঘুরে সাইফুলের প্রবেশ।)
সাইফুল    :    কাঁথা সরিয়ে। আজাহার কাকা। ও আজাহার কাকা।
আজাহার    :    (কাঁথার ভেতর থেকে মুখ বের করে) কীরে আমার বাল ছেড়ানির পূত?
সাইফুল    :    মিটি মিটি হাসে। চ্যাতো ক্যা? কী খাইছো আইজ? কও কিছু খাইবা?
আজাহার    :    (চোখ চকচক করে ওঠে)। দে। পাউরুটি দে।
(সাইফুল একটা পাউরুটি এনে দেয়। আজাহার গোগ্রাসে গিলতে থাকে।)
সাইফুল    :    আর খাইবা?
আজাহার    :    পাঁচটো ট্যাকা দে। এল­া নেশা খাবো। বেড়ি খাইলে পায়খানা পরিষ্কার হয়।
সাইফুল     :     (পাঁচটি টাকা দেয়) তাহলে একবার ‘আজাহার ডাম্ফ’ু কই?
আজাহার    :    ক। আবার ক। (ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে সাইফুলের দিকে।)

সালাম চোরের প্রবেশ। আজাহারকে বিড়ির সুখটান টুকু এগিয়ে দিয়ে বসে পড়ে পাশে।
সালাম    :    আজাহার কাকা, ক্যামুন আইছ্যাও?
আজাহার    :    হ। প্যাটফালানির ব্যাটা ভালোই আছি। তোর মায়ের … মুতোন আছি।
সালাম    :    কাকা, কী ব্যাপার স্যাপার? কিছু খাইবা নাকি?
আজাহার    :    হ খাবো। গাঙ্গে পানি নাইতো, তোর মায়ের গিলাডা খাবো।
সালাম    :    কাকা। এক মায়ের গিলা খায়্যা তোমার সাধ মেটে নাই।
আজাহার    :    উ মাগী তো মইরেই বাইচলো। এখুন আমাক তো কুনু শালাই হুকে না।
সালাম    :    (এদিক ওদিক তাকিয়ে) কাকা। শাহিদা আইসে নাই।
আজাহার    :    ঐ মোটা মাগীর বিটি? হ আসছিলো। ক্যা। তুই কী এখুনো ছুকছুক করিস না কি?
সালাম    :    কাকা। আবিয়াত কালের সম্পর্ক।
আজাহার    :    আয় হারামজাদা তোর মুখে মুতে দেই।
সালাম    :    কা কা ইডা কী কও।
আজাহার    :    আমার মুখের উপর থাইক্যা সর হারামজাদা। ভাত পায়না চা মারাছে। হাইগতে বইস্যা রেডিও বাজায়।
[নদীতে দলবেঁধে গোসল করছে। একঝাঁক ছেলের দল। পাড় থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে তারা নদীতে নামছে, আর উঠছে। বাজি দিয়ে দিয়ে নামছে।]
জয়নাল    :    ঐ শালা কলা গাছ খালি ভাইসে আসে। এত গাছ কুটিত থাইকে যে আসে।
জমিন    :    কলা গাছ ভাইসে যায়। মুনে হয় মলা মানুত।
জয়নাল    :    মলা মানুত? কিরে জমিন মলা মানুত?
(জমিন ভীষণ ক্ষেপে গিয়ে ফুসলাতে থাকে। ওর কথা আরো জড়িয়ে যায়। রাগে কথা বলতে পারে না। সবাই একসাথে বলতে থাকে মলা মানুত মলা মানুত।)
সকলে    :    হুররে! মলা মানুত! মলা মানুত।
জয়নাল    :    এ দুবলা তোল। দুবলা তোল।
সকলে    :    হুররে! দুবলা তোল। দুবলা তোল।
জয়নাল    :    দুবলা চোখের সামনে ধর সবাই, চোখের সামনে ধর।
সকলে    :    (লাল চোখের সামনে দুবলা তুলে ধরে)। কী রে জমিন দুবলা নে।
জয়নাল    :    এ জমিন ডুব দিয়ে দিয়ে চোখ লাল করিছু। দুবলা চোখের সামনে ধর। তাছাড়া বাড়িতে গেলে হেমান দিয়্যা দিবিনি।
সকলে    :    (চোখের সামনে দুবলা নিয়ে)
একটো ধানের দুডো শিষ
পাইল্ল্যা ভাঙ্গে ঠাসঠিস।
একটো ধানের দুডো শিষ
পাইল্ল্যা ভাঙ্গে ঠাসঠিস।

(সকলে বাড়ির দিকে চলে যায়।)

(মতিদের বাড়িতে গাভীর নতুন বাচ্চা হয়েছে।)
মতি    :    জয়নাল। একগোছা ঘাস নিয়্যা আয়।
জয়নাল    :    (ঘাস নিয়ে এসে বাছুরের মুখের কাছে ধরে)
হটো হটো হটো
ইদ্যাশে ঘাস নাই মুখ করো খাটো।
শাহিদা    :    জয়নাল। দুধটুকা গাঙে দিয়্যা আয়। মা গঙ্গাক দিয়া আয়।
জয়নাল    :    যাচ্ছি মা। (বালতি ভর্তি দুধটুকু নদীতে ঢেলে দিয়ে আসে।)
শাহিদা    :    বাবা গোরখো নাথেক স্মরণ করছু তো।
জয়নাল    :    হ মা। করছি।
মতি    :    মলোরে মলোরে। মুরগীর বাচ্চাডা মলোরে।
শাহিদা    :    (দৌড়ে এসে বাচ্চাটাকে কাকের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়।) জয়নাল। বেতের কাঠা আর বাঁশের ভাত নাড়া হাতাডা নিয়ে আয়।
জয়নাল    :    হ মা। আনতেছি।
শাহিদা    :    মুরগীর বাচ্চাডারে আছান দে।
জয়নাল    :    হ মা। কাঠা দিয়া ঢাইক্যা দিছি।

(জয়নাল মুরগীর বাচ্চাটকে বেতের কাঠা দিয়ে ঢেকে দেয়, আর ভাত নাড়া হাতাটা দিয়ে কাঠার উপর মৃদু আঘাত করে বলতে থাকে …)
হাঁসের বাচ্চা মরে
মুরগীর বাচ্চা বাঁচে
মুরগীর বাচ্চা বাঁচে
হাঁসের বাচ্চা মরে।


দৃশ্য চার:

(সলেমানের চায়ের দোকান। পর্দার আড়ালে শাহিদা এবং সালাম। দুইজন একসাথে গজা খায় আর হাসে।)
শাহিদা    :    কাইল আইসলে না ক্যা। নিজে খালি আসে না। আমার বুঝি রাগ হয় না।
সালাম    :    কাটাবাড়ি গেছুনু। ভায়রার বাড়ি।
শাহিদা    :    ঐ পাকা চোরডার সাথে আবার মিশতিছ্যাও। চরেত থাইকে আসে বাড়ি করছে ঐ চোরডা না?
সালাম    :    হাজার হোক ভায়রা তো।
শাহিদা    :    চোরে চোরে মাসতুতো ভাই। চোরে চোরে ভায়রা ভাই।
সালাম    :    তুমি আমারে নিজে মুখে চোর কইলা?
শাহিদা    :    হ কইছি। গোস্বা করলা?
সালমা    :    ইটটু খানি তো করছি।
শাহিদা    :    ওরে আমার জানের চোরর্ েকততো আন্নক করে।
সালাম    :    ক্যামনে আইলা ভরদুপুরে? মতি বাড়িত নাই?
শাহিদা    :    চাঁচকৈড়ের হাটে গেছে।
সালাম    :    তোমার দুধ খুব মিষ্টি সোয়াদ।
শাহিদা    :    আমার না। আমাদের গাইয়ের।
সালাম    :    ঐ হইলো। তোমারই যতœ করা গাইতো।
শাহিদা    :    তাই বলে কী এক হইলো। এবার তুমি দুধটুকু একদমে খাওতো। আর সলেমান ভাই। দুধের দাম কিন্তু পাঁচ টাকা করে বাড়ায়ে দিতে হবি। না হলে চাঁচকৈড় বাজারে পাঠাবো কিন্তু।
সলেমান    :    আচ্ছা দিবনি। তা আমার গজা কেমন খাইলে? মতি মিয়ারও খুব পছন্দ আমার গজা।
শাহিদা    :    তারে আবার সব বইলে দিয়েন না।
সলেমান    :    তা ই কথা আবার বলতে হবি না কি? (চলে যায়)
শাহিদা    :    মনে হলো তাই কলাম। হাতটা খুব ব্যথা করছে। গাই দোয়াইছি তো।
সালাম    :    (হাতটা ধরে) ইস। কী ফোলা ফোলা। লাল হয়ে উঠছে।
শাহিদা    :    তোমার হাতটা না। কী যে।
সালাম    :    কী?
শাহিদা    :    ডাক্তার।
সালাম    :    মতি না আমার বন্ধু।
শাহিদা    :    তাতে কী?
সালাম    :    এই পাকা রোদের মইদ্যে তুমি আইলে। (আরও কাছে সরে আসে) তোমার মুখের দিকে চাইলে খুব মায়া লাগে।
শাহিদা    :    বউয়ের জইন্য মায়া লাগেনা?
সালাম    :    লাগে না আবার?
শাহিদা    :    তাহলে ক্যান আইছো?
সালাম    :    নেশা। গজার নেশার লাহান তুমি আমার নেশা।
শাহিদা    :    আর বউ?
সালাম    :    ভাতের লাহান।
শাহিদা    :    নেশার ঘোরে ডুব দেও না?
সালাম    :    ডুব দিতেই তো আসি।
শাহিদা    :    নেশা কাটলে কী হইব।
সালাম    :    জানিনা। (দুজনেই চুপ করে থাকে)
শাহিদা    :    (উঠে দাঁড়ায়ে) আজকে আসি তাহলে।
সালাম    :    আর একটু। এই রোইদের মধ্যে কী করে বের হবে?
শাহিদা    :    কী করে আইলাম?
সালাম    :    যা গরম পড়েছে।
শাহিদা    :    আমার সম্পর্কে তোমার আগ্রহ বুঝি চালসে হয়ে যাচ্ছে।
সালাম    :    (শুষ্ক হাসি হেসে) তা না। এই নানান ঝামেলা আর কী।
শাহিদা    :    তা ইবার ঈদে বউকে কী দিবা?
সালাম    :    কী আর দেই? বউ তো আর পর হইয়ে যায় না।
শাহিদা    :    ওমা। তাই না কী? আমি বুঝি কিছু না দিলে পর হইয়ে যাব? বউয়ের প্রতি প্রেম একেবারে উথলে উঠছে দেখছি।
সালাম    :    ভালোবাসার নিয়মই এইরকম। একটা কমলে, একটা বাড়ে।
শাহিদা    :    উচ্চস্বরে হেসে ওঠে।
সালাম    :    খুব হাসলে যে।
শাহিদা    :    আমার হাসি দেখলে তোমার পরানডা নাকি জুড়ায়, তাই হাসলাম।
সালাম    :    ও আচ্ছা। তামাসা হচ্ছে আমাকে নিয়ে?
শাহিদা    :    সারাটা জীবনই যখন তোমাকে নিয়ে তামাসা করলাম। আজ আর তার ব্যতিক্রম হয় ক্যামনে?
সালাম    :    আজ তোমার কী হয়েছে বুঝতে পারতেছি না।
শাহিদা    :     কী করে বুঝবে? মেয়ে মানুষের কত কী হয়। পুরুষ মানুষ তার কতটুকুই বা বোঝে।
সালাম    :    হ।
শাহিদা    :    বউয়ের প্রতি এত প্রেম জেগেছে যে আমি একেবারে পর হয়ে যাচ্ছি, তাই না?
সালাম    :    চুপ করে থাকে। ঠা ঠা রোদের মধ্যে শাহিদা বেরিয়ে যায়।


দৃশ্য পাঁচ:

(সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। নদীর ধারে বিলের কিনারে একটা জটলা। সালাম গাঁজায় দম দিয়েছে। সবাই গোল হয়ে বসে আছে। রহিম কোনোদিন গাঁজা সেবন করেনি। গাঁজায় টান দিয়ে উদভ্রান্তের মতো ছুটতে থাকে। কয়েকজন ওকে আটকায়। জাহাঙ্গীর টান দিয়ে হো হো করে হাসতে থাকে।)
রহিম    :    (হাসতে হাসতে বেহুঁশ হয়ে যায়) এ আমি হাইগবো। আমার গোয়া কই?

(সালামের ঘর। গভীর রাত।)
সালাম    :    (বস্তা হাতে নিতে থাকে)। বউ সাথে সাথে উঠে আটকায়। ছেড়ে দে না। একটু হাওয়া খেয়ে আসি। দেখিস না কত গরম পড়ছে।
আম্বিয়া    :    না আইজ বাইরে যাওয়া যাবি ন্যা। তোমার আল্লা-রসুলের দোহাই লাগে। আর চুরি কামে যাইও না।
সালাম    :    চুরি না তো। একটু ঘুইরে আসি।
আম্বিয়া    :    বাইরে যাওয়া যাবি ন্যা। আমার এক কথা।

(সালাম বিছানা থেকে উঠতেই আম্বিয়া খপ করে ধরে শুইয়ে দেয়। সারারাত আম্বিয়া চোখ বন্ধ করে না। সালাম কিছুতেই বের হতে পারে না।
বউ ঘুমিয়েছে। সালাম চুপিসারে উঠে বস্তাখানা হাতে নিয়ে দরজা খুলে হাঁটা শুরু করে। আম্বিয়া পাথরের মতো নীরবে বস্তাখানা টেনে ধরে। সালাম চমকে ওঠে।)
সালাম    :    (চমকে  উঠে) এই। পানি খাব আর কী?
আম্বিয়া    :    এই নাও তোমার পানি।
সালাম    :    গরম পড়েছে তো। তাই মুনে করলাম ছালাখান হাতে নিয়ে বের হই। এই ছালা পেতে একটু বাতাসে ঘুমাবো আর কী।
আম্বিয়া    :    খুব গরম পড়েছে, না?
সালাম    :    হ।
আম্বিয়া    :    জোর করে টেনে আনে। আসো ঘুমাও। আমি বাতাস করছি।
(আম্বিয়া বাতাস করতে করতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। সালাম চুপিসারে উঠে পরখ করে নেয় আম্বিয়া ঘুমিয়েছে কী না। দরজাটা ভিজিয়ে দিয়ে সে মাঠ থেকে পর পর তিন বস্তা রসুন চুরি করে আনে। এবারের ঈদে সে বউকে একটা রাজশাহী সিল্কের শাড়ি কিনে দেবে। মনে মনে কান ধরে তওবা করেছে শাহিদার কাছে আর যাবে না। হাজার ডাকলেও না। কাঁদলেও না।)

(সকালে সবাই ঘুম থেকে উঠে গাঁয়ের লোকেরা যার যার জমির দিকে যায়। জমিতে রসুন না দেখে মাথা খারাপ হয়ে যায়। জাহাঙ্গীর, রহিমের জমির রসুন নেই। বড়ো বড়ো রসুনের গাছগুলোই নেই। সালামকে সন্দেহ করে। কিন্তু কাউকে বলতে পারে না। সালাম তো ওদের সাথেই ছিল। চুরিটা করলো তাহলে কে?)
সালাম    :    (ঘরের আড়াতে বসে রসুন কাটে আর তালাইয়ের উপর রাখে।) বউ তোমারে আমি একটা সিল্কের শাড়ি দেবই দেব।
আম্বিয়া    :    নিকুচি করি তোমার শাড়ির। আর গুণ নাই ছারগুণ আছে। হাগা নাই প্যাড়পেরি আছে। চুরির শাড়ি আমি পরব না।
সালাম    :    শাড়ি না পরলে না পরবে। তোমার পায়ে পড়ি। চুপ করো। লোকে শুনলে আমার হাড্ডি আর আস্ত রাখবিনানে।
আম্বিয়া    :    (চুপ করে যায়)্ একটু থেমে তোমার শাড়ি কে চায়? আমি কী চাই বুঝ না?
সালাম    :    আমার জীবনে কখনো সুখ হবে না বউ।
আম্বিয়া    :    কেনো? চোরেরা কী ভালো হতে পারে না? তুমি পেশাডা ছেইড়ে দাও।
সালাম    :    ছাড়তে চাই।
আম্বিয়া    :    আমার সাধ-আহ্লাদ কিছু কী থাকতে নেই?
সালাম    :    (চুপ করে থাকে)।
আম্বিয়া    :    আমার টাকা-পয়সা, শাড়ি-গয়না কিচ্ছু চাই না। শুধু পরানের সাথে পরানডা চাই। (আম্বিয়া কাঁদতে থাকে।)

(আম্বিয়া আজ শোল মাছের ঝোল রান্না করেছে। সালাম প্রাণ ভরে খায়। আম্বিয়া চেয়ে চেয়ে দেখে আর খুশিতে হাসতে থাকে। আজ জাহাঙ্গীরের বিয়ে। মাঠ পেরিয়ে হেঁটে যায় বরযাত্রী দল। সালাম আছে। রহিমও আছে সাথে।)

( মোল্লা ডাকা হয়েছে। কাজী ডাকা হয়েছে। কলমা পড়ানো শুরু হয়েছে। হঠাৎ জাহাঙ্গীরের হাত পা মোচড় দিয়ে উঠছে। গাজার নেশা পেয়ে বসেছে ওকে। কলমা পড়ানোর পূর্বমুহূর্তে হবু চাচা শ্বশুর বাবলু, নবজামাতেকে নিয়ে নিজের ঘরে দরজার খিল বন্ধ করে দিল। শ্বশুর-জামাই নিজেদের আঁশ মিটিয়ে নেশা করে দরজা খুললো। বিয়ের কলমা পড়া হলো। কাবিন হলো। নতুন বউকে রেখে মাঠ পেরিয়ে পুনরায় বাড়ির দিকে যাত্রা করলো। বরযাত্রী দল বাড়ি পৌঁছার আগেই পুনরায় নেশা চাপলো। বরকে নিয়ে সালাম নেশার আড্ডায় গেল। বরযাত্রী দল রাগে ফুসতে ফুসতে বাড়ির দিকে যাত্রা করলো। সামনে ঈদ। ছোটো ভাই শরপেশের বিয়ে তাই শাহিদা খুব ব্যস্ত। বোকশোকা ভাইকে শিখিয়ে পরিয়ে নিচ্ছে শাহিদা। জয়নালের আনন্দের শেষ নেই। মতি খুব ব্যস্ত। একমাত্র শালার বিয়ের প্রস্তুতি নিয়ে। শাহিদার কন্ঠে মেয়েলি গীত।)
শাহিদা    :    বুঝলি শরপেশ, শ্বশুর বাড়ি গিয়ে যেখানে সেখানে বসবি না। চেয়ার বেঞ্চ বা বিশেষ কোনো উঁচু জায়গায় বসবি, বুঝলি?
শরপেশ    :    হ।
শাহিদা    :    লোকজনের সাথে আলাপ-পরিচয় হবি। ভালো-মন্দ জিজ্ঞাসা করবি। বিবাহিত অবিবাহিত কিনা, বুঝে কথা বলবি। প্রয়োজনে জিজ্ঞাসা করবি। ঠিক আছে?
শরপেশ    :    হ।
শাহিদা    :    খাবার দাবার গোগ্রাসে খাবি না। ধীরে সুস্থে খাবি। ইচ্ছে থাকলেও অনেক সময় পেট পুরে খেতে নেই।
শরপেশ    :    হ।


দৃশ্য ছয়:

(বিয়ের পর নতুন জামাতা হিসেবে শরপেশ শ্বশুর বাড়ি যাত্রা করলো। সবার সাথে একে একে সালাম বিনিময় করে সে। প্রথমে শ্বশুরের সাথে দেখা।)
শরপেশ    :    আব্বা সালাম।
শ্বশুর    :    ওয়ালাইকুম আসসালাম।
শরপেশ    :    আম্মা সালাম।
শাশুড়ি    :    ওয়ালাইকুম আসসালাম।
(এবার ভায়রা ভাই এবং শালা-শালীরা জামাইকে বাড়ির ভিতর নিয়ে গেলো। জামাইকে বসতে দেওয়ার জন্য সম্বন্ধী বউরা চেয়ার নিয়ে এলো।)
সম্বন্ধী বউ    :    দুলা মিয়া বসুন। ( নেপথ্য কন্ঠে মেয়েলীগীত)

কী দিয়া ভাত দেব তাওইরে?
কী দিয়া ভাত দেব বিয়াইরে কী?
কী দিয়া ভাত দেব জামাইরে?
ছুঁচা মাইরা ভাত দেব তাওইরে,
কুত্তা মাইরা ভাত দেব বিয়াইরে,
খাসি মাইরা ভাত দেব
ও সোনার জামাইরে।

শরপেশ    :    (উঁচু জায়গায় বসার কথা মনে পড়ে গেলো।) তাহলে উঁচুতেই বসি বলে মুরগীর ঘোরার উপর বসতে গেলো সে।
(সম্বন্ধী বউরা এ যাত্রা বাঁচিয়ে দিল। ভাবলো জামাই বুঝি একটু শরীরট টান করে নিচ্ছে। তারা ধরে চেয়ারে বসিয়ে দিল।)
লোকজন    :    সবাই জামাইয়ের খুব তারিফ করছে। ছোট বড়ো সকলকে হাত উঁচিয়ে সালাম দিচ্ছে।
নতুন বউ    :    তাই নাকি?
(বউয়ের দেখতে শখ হলো তার জামাই কিভাবে বসে আছে)।
(এদিক ওদিক তাকিয়ে মনে মনে বউয়ের খোঁজ করছে। বউ উঁকি দিয়ে একবার জানালার ফাঁক দিয়ে জামাইকে দেখার চেষ্টা করছে। এমন সময় বরের সাথে চোখাচখি হয়ে গেল।)
শরপেশ    :    ‘ভুলকি সালাম’ বলে জামাই বউয়ের দিকে তাকিইে রইল বাড়ি শুদ্ধ লোকেরা মুখ চাওয়া-চাওয়ি শুরু করে দিল।

( সকলের সাথে পরিচয়ের পরব। একে একে অনেকেই পরিচিত হলো। শ্বশুরের সাথে পরিচয়।)
শরপেশ    :    আমি এই বাড়ির নতুন জামাই। গত পরশু বিয়ে করেছি, বুঝলেন?
শ্বশুর    :    ঠিক আছে বাবা বসো বসো।
শরপেশ    :    জি আব্বা। মানে আপনি ভালো আছেন? আব্বা আপনি কি বিয়ে করেছেন? খুব ভালো। খুব ভালো (মুখে হাত দিয়ে শ্বশুর দ্রæত প্রস্থান করলেন)।
(নতুন জামাইকে বউ খেতে দিয়েছে।)
শরপেশ    :    তরকারি খুব স্বাদ হয়েছে।
(নতুন বউ খুশিতে আটখানা)
শরপেশ    :    তরকারিটা কিসের আছিল বউ?
নতুন বউ    :    কচি বাঁশের। বাঁশকোড়ল।
শরপেশ    :    আমাদের ঘরের আড়ার সাথে অনেক বাঁশ আছে। তুমি আমাকে প্রতিদিন রান্না করে দেবে কিন্তু (বউয়ের আক্কেল গুড়–ম)।
নতুন বউ    : ঘরের আড়ার বাঁশ কেউ খায় না কী!
শাশুড়ি    :    বাবা শরপেশ দই খাও।
শরপেশ    :    দই হাতে নিয়ে একদমে খেয়ে নিল।
(শ্বশুর মাঠে গেছে হাল চাষ দিতে, শাশুড়ি নিজের কাজে ব্যস্ত। জামাই মনে করলো গাভীটা দেখে আসি।)
শরপেশ    :    তোমাদের বাড়ির দই না খুব স্বাদ। আমি খুব মজা করে খেলাম।
বউ    :    ওমা তাই?
শরপেশ    :    দই কোথা থেকে হয় গো?
বউ    :    গাভী থেকে, মানে গাভীর দুধ থেকে।

(জামাতা শরপেশ একবার ফাঁক বুজে গাভী দেখতে গেল গোয়ালে। ঘরে সে মনে করলো এবার একটু দই খেয়ে নেয়। কিছুতেই দই পাওয়া গেল না দেখে সে গরুটিকে শক্ত করে ধরার চেষ্টা করলো। গরুটি দ্রæত ঘুরে ওঠায় সে দড়ির সাথে আটকে গেল। চিৎকার দিলে শাশুড়ি এসে তাকে উদ্ধার করলো। উদ্ধার হয়েই জামাতা বাড়ির দিকে পালালো। দই খাওয়ার সাধ তার মিটে গেছে।)


দৃশ্য সাত:

(নেশার টানে সালাম পুনরায় শাহিদার কাছে ছুটে গেল। শাহিদা বাড়িতে একাই ছিল। সালাম এসে বাড়িতে প্রবেশ করলো।)
শাহিদা    :    তুমি বার বার আমার কাছে ছুটে আসো কেনো?
সালাম    :    থাকতে পারি না তাই।
শাহিদা    :  তোমার বউ তোমাকে আটকায় না?
সালাম    :    চেষ্টা করে। পারলে তো।
শাহিদা    :    তুমি একখান পাকা চোর।
সালাম    :  তোমার লাইগাই তো চোর আমি।

(ইতিমধ্যে মতির গলা শোনা যায়)
মতি    :    জয়নালের মা, ঐ শাহিদা মাগী কথা শুনিস না ক্যা?
শাহিদা    :    (সাজগোজ নিয়ে ব্যস্ততা দেখায়) মুখে স্নো মাখে। ঘর থেকে বের হতে সময় নেয়।)
মতি    :    আসিস না ক্যা?
শাহিদা    :    খাড়াও। আর একটু।

(সালাম গিয়ে দরজার কপাটের আড়ালে লুকিয়ে থাকে।)
মতি    :    সোনার চান তিতলা ঘুঘু একটু বাইরে আসো।
শাহিদা    :    তুমি চোখটা বন্ধ করো। আমি না বলা পর্যন্ত খুলবা না কিন্তু।
মতি    :    এই চোখ বন্ধ করলাম।
শাহিদা    :    মতির চোখ হাত দিয়ে বন্ধ করে ধরে। খুলবানা কিন্তু। (সালাম চুপিচুপি বেরিয়ে যায়)
শাহিদা    :    চোখ খোলো। আমারে দেখো।
মতি    :    তোমারে আমি ঈদের আগেই এখানা শাড়ি কিনে দেব।  তোমাওে আইজ এছাই সুন্দর লাগছে।
শাহিদা    :    তয় ঘরে আসো।
মতি    :    চলো।

(শাহিদা এবং মতি একদিন গাভী দোহন করতে ব্যস্ত। সালামকে দূর থেকে দেখতে পায় শাহিদা। হাতের ইশারা দেয়।)
শাহিদা    :    (মতিকে উদ্দেশ্য করে) তুমি তো গাই দোহাইতে একদম পাকা। এবার দেখাওতো দেখি চোখ বুজে দোহাইতে পারো কিনা?
মতি    :    এইডা কোনো ব্যাপার হইল বউ।
শাহিদা    :    হাচাই?
মতি    :    এই দেখো।

ইতোমধ্যে সালাম এসে শাহিদার সাথে হাতের স্পর্শ (আলিঙ্গন) সেরে নিল। শাহিদার হাতে বাছুরের দড়ি তখনও।
মতি    :    (চোখ বন্ধকরে) হচ্ছে বউ?
শাহিদা    :    হ্যাঁ, খুব ভালো হচ্ছে।
(সালাম খুব দ্রুত সটকে পড়লো।)

(রাত। সালামের ঘর। সালাম প্রতিজ্ঞা করেছে আর সে শাহিদার কাছে যাবে না। আজ রাতে রসুন চুরি করেই তার শেষ। সে বস্তা নিয়া বের হবে।)

আম্বিয়া    :    কই যাও।
সালাম    :    এই একটু বাইরে।
আম্বিয়া    :    না, যাওয়া যাবে ন্যা।
সালাম    :    গরম পড়ছে যে।
আম্বিয়া    :    পাখার বাতাস কইরবনি।

(আজ খুব বেশি চেষ্টা করেনি। এবার ঘুমিয়ে পড়ে। নাক ডাকার শব্দ শুনে আম্বিয়াও ঘুমিয়ে যায়। সালাম চুপি চুপি বস্তা নিয়ে শাহিদার পাড়ার দিকে যায়। আজ সে রসুনের ক্ষেতে চুরি করতে যায় না। হারিকেন নিভিয়ে দিয়ে মতি চোখ বুঝে ঘুমের মতো পড়ে আছে। বাঁশের বাতার খসর খসর শব্দে সজাগ হয়।

মতি সতর্কভাবে প্রস্তুত হয়। সালাম সন্তর্পণে ঘরের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে। চৌকাঠ পার হওয়ামাত্র মতি তাকে জাপটে ধরে পিঠমোড়া করে বাঁধে। দুই বাপ বেটা মিলে উত্তম মধ্যম দেয়। সকালে বিচার হয়।)

প্রধান      :    সালাম, তুই কেন চুরি করতে গেছিলি?
সালাম     :    নিরুত্তর।
মতি       :    বন্ধু হয়্যা, তুই আমার ঘরে চুরি করতে আসলি?
সালাম    :    নিরুত্তর।
(বিচারে সালামের পাঁচ হাজার টাকা জরিমনাা এবং পঞ্চাশ জুতার বাড়ি দেয়া হলো।

(আম্বিয়ার মনে আনন্দ।)

আম্বিয়া     :    (স্বগতোক্তি) মনে করছিলাম সে শাহিদার ঘরে গিয়েছিল। কিন্তু না, সে প্রকৃতই চুরি করতে গেছিল। শাহিদার জন্য যায় নাই। শাহিদার জন্য গ্যালে বস্তা হাতে নিত না। সে চোর হোক কিন্তু আমারই আছে। শাহিদার তো আর হয় নাই।

শাহিদা আর সালাম একবার মাত্র চোখাচখি করে। কেউ কোনো কথা বলে না। শাহিদা মনে করলো সে এত ছোটলোক। তার ঘরে চুরি করতে আসে? তবে কেন সে শুধু আমার (শাহিদার) জন্য এলো না? চোর হয়ে এলো কেন?